Wednesday

17-06-2026 Vol 19

চরম বিপাকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, তবু কেন এখনও গ্রেফতার হচ্ছেন না?

রিপোর্টার : নীলাঞ্জনা সাহা,কলকাতা –  রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলির মধ্যে অন্যতম অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে চলা সিআইডি তদন্ত। তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদককে একাধিকবার ভবানী ভবনে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে তদন্তকারী সংস্থা। দীর্ঘক্ষণ ধরে চলেছে জেরা। কিন্তু এত কিছুর পরেও এখনও কেন গ্রেফতার করা হয়নি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে? সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের আলোচনায়।
গোটা বিতর্কের সূত্রপাত বিধানসভার একটি গুরুত্বপূর্ণ নথিকে কেন্দ্র করে। বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের জন্য জমা পড়া একটি প্রস্তাবপত্রে কয়েকজন তৃণমূল বিধায়কের স্বাক্ষর জাল বা তাঁদের অজান্তে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। ওই প্রস্তাবে প্রবীণ তৃণমূল নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম ছিল বলে জানা যায়। অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতেই শুরু হয় রাজনৈতিক বিতর্ক এবং পরে তদন্তের দায়িত্ব নেয় সিআইডি।
তদন্ত চলাকালীন একাধিক বিধায়কের বক্তব্য রেকর্ড করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন রিতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতেই বিষয়টি আরও গুরুত্ব পায় এবং তদন্তের গতি বাড়ে। তদন্তকারীরা সংশ্লিষ্ট নথি, স্বাক্ষর এবং নেপথ্যের যোগাযোগের তথ্য খতিয়ে দেখতে শুরু করেন।
ইতিমধ্যেই দু’দফায় ভবানী ভবনে হাজিরা দিয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে চলে জিজ্ঞাসাবাদ। একই মামলায় তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষকেও ডেকে পাঠানো হয়। প্রয়োজনে দু’জনকে মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করার সম্ভাবনাও নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছিল রাজনৈতিক মহলে।
শুধু জিজ্ঞাসাবাদই নয়, তদন্তের স্বার্থে কালীঘাটে তৃণমূলের দফতর-সহ একাধিক জায়গায় তল্লাশিও চালিয়েছে সিআইডি। তদন্তকারীরা বিভিন্ন নথি ও তথ্য সংগ্রহ করে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র বোঝার চেষ্টা করছেন।
এদিকে মামলাটি পৌঁছে গিয়েছে কলকাতা হাইকোর্টেও। শুনানির সময় বিচারপতি কৃষ্ণ রাও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন। বিশেষ করে অভিযোগ ওঠার পর বিধানসভার স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় কেন সিদ্ধান্ত নিতে কয়েকদিন সময় নিলেন, তা নিয়েও আদালতে প্রশ্ন ওঠে। আদালতের পর্যবেক্ষণ মামলাটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
তবে এতসব নাটকীয় ঘটনার পরেও এখনও গ্রেফতার নন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। কেন?
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাঁকে গ্রেফতার করা যায় না। তদন্তকারী সংস্থাকে প্রথমে এমন প্রাথমিক প্রমাণ সংগ্রহ করতে হয়, যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রত্যক্ষ ভূমিকার ইঙ্গিত দেয়। পাশাপাশি তদন্তে প্রভাব বিস্তার, সাক্ষীদের প্রভাবিত করা বা প্রমাণ নষ্ট করার আশঙ্কা থাকলেও গ্রেফতারের প্রশ্ন উঠে আসে।

বর্তমানে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তদন্তে সহযোগিতা করছেন এবং সিআইডির ডাকে হাজিরাও দিচ্ছেন। ফলে আইনের দৃষ্টিতে শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিতর্ক বা অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁকে গ্রেফতার করার পরিস্থিতি এখনও তৈরি হয়নি বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের দাবি, তদন্ত যত এগোচ্ছে ততই তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠে আসছে। পাল্টা তৃণমূলের অভিযোগ, গোটা ঘটনাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বিরোধীদের চাপেই বিষয়টিকে অযথা বড় করে দেখানো হচ্ছে।
ফলে এই মুহূর্তে একথা বলা যায় যে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় রাজনৈতিক ও আইনি— দুই ক্ষেত্রেই যথেষ্ট চাপে রয়েছেন। কিন্তু তদন্তকারী সংস্থার হাতে এখনও এমন কোনও তথ্যপ্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি, যার ভিত্তিতে গ্রেফতারের মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া যায়। তবে তদন্ত যত এগোবে, ততই স্পষ্ট হবে এই মামলার ভবিষ্যৎ এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক লড়াই কোন দিকে মোড় নেয়।

রিপোর্টার : নীলাঞ্জনা সাহা, কলকাতা ।

Editor